চারদিকে এত কাজের মধ্যেও একটা কথাই বারবার মাথায় ঘুরতে থাকে—এমন কী করা যায় যাতে তোমাকে আরও একটু নিজের কাছে রাখতে পারি? যত ভালো বন্দোবস্তই করি না কেন, মনটা যেন শান্তি পায় না।

মা হওয়া সত্যিই ভীষণ কঠিন।

অফিসের বার্ষিক রিপোর্ট হোক, নতুন কোনো প্রজেক্ট হোক—সব কিছুর মাঝেও মনে হয়, তুমি কী খাচ্ছ? কী করছ? ঠিক আছ তো?

তোমার মুখ থেকে একটি কষ্টের শব্দ শুনলেও মনে হয়, এ যেন আমারই কোনো ব্যর্থতা।

হয়তো এভাবেই অধিকাংশ নারী জীবন এক পর্যায়ে এসে অর্ধেক উন্মাদ হয়ে যায়—সন্তানের জন্য অবিরাম ভাবতে ভাবতে।

নিজের লাঞ্চ, নিজের যত্ন, নিজের প্রয়োজন—সবকিছুই যেন দ্বিতীয় হয়ে যায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ChatGPT খুলে বসি—তোমার ডায়েট ঠিক আছে তো? আমি কি তোমার জন্য সঠিক দুধটাই বেছে নিচ্ছি?

ভাবি, তোমার জন্য নতুন জামাকাপড় কিনব, দরকারি জিনিস কিনব। অথচ নিজের দিকে তাকালে দেখি, প্রায় এক বছর ধরে সেই দুটো অন্তর্বাসই ধুয়ে ধুয়ে ব্যবহার করছি; রং পর্যন্ত ফিকে হয়ে গেছে।

মাতৃত্ব বড় ভয়ংকর এক অনুভূতি।

কখনও মনে হয়, মা বলেই আমি এত ত্যাগ করছি। আবার কখনও মনে হয়, মা বলেই এত লড়ে যেতে পারছি। অনুভূতিটা একই থাকে, শুধু সময় বিশেষে তার প্রকাশের ধরন বদলে যায়। ট্রিগার পয়েন্টগুলো আলাদা হয়, কিন্তু কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটাই মানুষ—আমার সন্তান।

তুমি হয়তো একদিন বড় হবে। আমার অনেক কথার ভুল ধরবে, অনেক সিদ্ধান্তকে সেকেলে বলবে। হয়তো মনে হবে আমি কিছুই বুঝি না, এই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি না।

সেটা খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু একটা কথা যেন কোনোদিন ভুলো না—আমরা মা-বাবারা নিখুঁত নই, সব সময় সঠিকও নই। তবু তোমাদের মুখে একটু হাসি, জীবনে একটু স্বাচ্ছন্দ্য, আর ভবিষ্যতে একটু বেশি সুযোগ দেওয়ার জন্য আমরা নিজেদের কাঁধে অনেক বোঝা তুলে নিই।

সেই বোঝা শুধু অর্থের নয়।

অনেক সময় তা মানসিক ক্লান্তির, অগণিত দুশ্চিন্তার, অপূর্ণ ইচ্ছের, চাপা কষ্টের। অনেক রাতের নির্ঘুম ভাবনা, অনেক না-বলা ভয়, অনেক ব্যক্তিগত স্বপ্নকে একটু দূরে সরিয়ে রাখার গল্পও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

তোমরা যাতে একটু নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারো, তার জন্য আমরা অনেক সময় নিজেদের পথটাকে আরও কঠিন করে নিই। তোমরা যাতে পড়ে গেলে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পাও, তার জন্য আমরা নিঃশব্দে নিজেদের শক্তিটুকু খরচ করি।

বদলে খুব বেশি কিছু চাই না।

শুধু কোনো একদিন, যখন তুমি নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তখন হয়তো এক মুহূর্তের জন্য মনে পড়বে—তোমার জন্য কেউ একসময় নিঃশর্তভাবে চিন্তা করত। তোমার ছোট্ট হাসির জন্য নিজের বড় বড় উদ্বেগগুলো লুকিয়ে রাখত।

সেদিন যদি আমাদের সব সিদ্ধান্তকে না-ও বোঝো, অন্তত আমাদের ভালোবাসাটুকু বোঝার চেষ্টা করবে

সেদিন হয়তো আমার প্রতিটি কথার সঙ্গে একমত হবে না। আমার সব সিদ্ধান্তকেও সঠিক বলবে না। কিন্তু বুঝতে পারবে, ভালোবাসা আর পরিপূর্ণতা এক জিনিস নয়। আমরা ভুল করেছি, তবু ভালোবেসেছি। আমরা হোঁচট খেয়েছি, তবু তোমার জন্য পথ তৈরি করার চেষ্টা করেছি।

তখন হয়তো মনে পড়বে—একজন মানুষ ছিল, যে দিনের শত কাজের মধ্যেও ভাবত তুমি খেয়েছ কি না। যে নিজের প্রয়োজনকে বারবার পিছিয়ে দিয়ে তোমার ছোট ছোট চাওয়াগুলো পূরণ করতে চাইত। যে তোমার ভবিষ্যতের জন্য এমন দুশ্চিন্তা করত, যেন পৃথিবীর সব ঝড় একা সামলাতে হবে তাকে।

আর সেদিন হয়তো তুমি বুঝবে, মা-বাবার ভালোবাসার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তার স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করার ক্ষমতা। কখনও কখনও বহু বছর ধরে।

তাই হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি—একদিন তুমি বুঝবে।

আর যদি পুরোটা না-ও বোঝো, তবু আমার এই অগাধ ভালোবাসার একটু অংশ যেন তোমার হৃদয়ে পৌঁছে যায়, সেটুকুই যথেষ্ট। ❤️


তুমি আমার অংশ।
আমার আত্মার আত্মীয়।
আমার আত্মজ।

তোমার মধ্যে আমার হৃদয়ের এক টুকরো চিরদিন বেঁচে থাকবে, তুমি যত দূরেই যাও না কেন।

পৃথিবীর কোনো সম্পর্কই আমার কাছে তোমার মতো নয়। কারণ তোমাকে আমি শুধু ভালোবাসি না, তোমার সঙ্গে আমি নিজেকেও বহন করি।

তাই মনে হয়, পৃথিবীর সব কঠিন পরীক্ষা, সব প্রতিকূলতা, সব আঘাত যেন আগে আমার উপর দিয়েই যাক। তোমার কাছে পৌঁছাতে হলে যেন সেগুলোকে আগে আমাকে অতিক্রম করতে হয়।

আমি জানি, সেটা সবসময় সম্ভব নয়। জীবন প্রত্যেক মানুষকেই তার নিজের লড়াই লড়তে শেখায়। তোমাকেও শিখতে হবে, পড়তে হবে, উঠে দাঁড়াতে হবে।

তবু একজন মা হিসেবে আমার প্রার্থনা একই থাকে—
তোমার কষ্টের কিছুটা যদি আমি নিতে পারতাম,
তোমার চোখের জলের কিছুটা যদি আমার চোখে এসে পড়ত,
তোমার পথের কিছু কাঁটা যদি আমার পায়ে বিঁধত,
তাহলে হয়তো নিজেকে একটু সফল মনে হতো।

কারণ মাতৃত্বের সবচেয়ে গভীর সত্যি বোধহয় এটাই—
সন্তানকে শক্ত হতে শেখাতে হয়,
কিন্তু মন চায় তাকে সব আঘাত থেকে আড়াল করে রাখতে।

তুমি আমার অংশ,
কিন্তু তুমি আমার সম্পত্তি নও।
তুমি আমার হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ,
যাকে একদিন নিজের ডানা মেলে উড়ে যেতে হবে।





Comments

Popular posts from this blog